Thursday, October 21, 2010

র‌্যাবকে সামলাতে হবে!

র‌্যাব কী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের লাইসেন্স পেয়েছে?

নিয়ন্ত্রণহীন বেসামাল হয়ে পড়েছে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন র‌্যাব। ভেঙে পড়েছে এই বাহিনীটির শৃংখলা। র‌্যাব এখন চলছে অদৃশ্য শক্তির কমান্ডে। সেই শক্তিকে খুশি করাই এখন এই বাহিনীর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে! দাগী আসামী, দুধর্ষ সন্ত্রাসীদের পাকড়াও করার পরিবর্তে র‌্যাব এখন ব্যবহার হচেছ সরকারের স্বার্থে। ঘটিয়ে চলেছে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, একটি মর্যাদাকর আধুনিক ও এলিট ফোর্স
হিসেবে ইমেজ গড়ে উঠতে ব্যার্থ হয়েছে এই বাহিনী। তারা এলিট ফোর্স হিসেবে ইতোপূর্বে যে সম্মানজনক ইমেজ গড়ে তুলেছিল সেটি এখন সম্পুর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, গুপ্তহত্যা, নীরিহ ব্যক্তিদের অস্ত্র মামলায় ফাঁসানো, সামারি বাণিজ্য, ও তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিতর্কিত কর্মকান্ডে র‌্যাবের ভঙুর ইমেজ আরো ম্লান হয়ে পড়ছে। র‌্যাবের বহু সদস্য জড়িয়ে পড়েছে নানা অপরাধে। অস্ত্র উদ্ধার নাটক সাজানো ও কল্পকাহিনী তৈরি করে মিডিয়ায় প্রচার করতেও র‌্যাবের জুড়ি নেই। চারদলীয় জোট সরকারের সময় পুলিশের দুর্বল ও ভঙ্গুর ইমেজের কারনে উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশেও একটি এলিট ফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেয়। কেউ কেউ বলেন, র‌্যাবের জন্মই হয়েছে বিচার বহির্ভূত হত্যকাণ্ড ঘটানোর অর্থাৎ ক্রসফায়ারের নামে মানুষ মারার জন্য। আর হয়েছেও তাই। প্রতিষ্ঠার পর শুরু এখনো চলছে। কারওয়ান বাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানকে দিয়ে শুরু এখনো চলছে। এই বাহিনীর হাতে ক্রসফায়ার হয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। প্রথম দিকে ক্রসফায়ারের জন্য কিছু নিয়মনীতি ও উপরের গ্রীন সিগন্যাল নিতে হতো। এখন কিছুই করা হচ্ছে না। যাতে তাকে ধরে ক্রসফায়ারে দেয়া হচ্ছে। করা হচ্চে পলিটিক্যাল ক্রসফায়ারও। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল বাহিনীটির ভাবমূর্তি হবে উজ্বল। সন্ত্রাস দমনে তারা থাকবে সিদ্ধহস্ত। সেজন্য উন্নত দেশের বিভিন্ন এলিট ফোর্সের আদলে র‌্যাবকে দেয়া হয় সর্বাধুনিক অস্ত্র, গাড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম। সুযোগ সুবিধার দিক থেকেও তাদেরকে আইনপ্রয়োগাকারি অন্যান্য বাহিনী থেকে অনেক এগিয়ে রাখা হয়। ক্ষমতাও দেয়া হয় বেশুমার। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, বিডিআর ও কোস্টগার্ড থেকে বাচাই করা চৌকস সদস্য নিয়ে গড়ে তোলা হয় র‌্যাব। শুরুতেই এর মূলনীতি নির্ধারণ করা হয় ‘জিরো টলারেন্স’। অর্থাৎ এই বাহিনীর কোন সদস্য অন্যায় অবিচার ঘুস দুর্নীতির মতো কোন অপরাধে জড়িত হতে পারবে না। সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা হবে জিরোটলারেন্স। শুরুর দিকে র‌্যাবের কর্মকাণ্ড দাগী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকে। চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ও ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা র‌্যাবের ক্রসফায়ারের ব্যাপক সমালোচনা করেন। কেউ কেউ এই বাহিনীটি বন্ধ করে দেয়ার কথাও বলেন। কিন্তু বর্তমান স্বরাষ্ট্র সাহারা খাতুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর ঘোষণা দেন র‌্যাব বন্ধ করা হবে না। বরং সরকারের বিশেষ প্রয়োজনে কাজে লাগানো হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতিফলন কিছু দিনের মধ্যেই শুরু হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসর পরপরই চরম বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারনে র‌্যাবের ইমেজ ক্ষুন্ন হতে থাকে। গত দেড় দুই বছরে র‌্যাবের ইমেজ এখন শুণ্যের কোটায়। র‌্যাব পরিনত হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন বেসামাল সরকারি রাজনৈতিক দলের তাবেদার একটি বাহিনীতে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, নিরীহ লোককে অন্ত্র ও মাদক মামলায় জড়িয়ে হয়রানী, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ি অর্থ আদায়, অভিযানের নামে বাসা বাড়িতে গিয়ে মালামাল লুট, গ্রেফতার বাণিজ্যসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে র‌্যাব। একের পর এক বিতর্কিত ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, গুপ্তহত্যা, অপহরণের মতো গুরুতরও অপরাধের অভিযোগ উঠতে থাকে র‌্যাবের বিরুদ্ধে। র‌্যাব পরিচয় পেয়ে ভুক্তভোগীরা এর প্রতিবাদ করার সাহস পায়না। অনেক ক্ষেত্রেই ক্রসফায়ারের ভয়ে কেউ নিজের নাম পরিচয়ে উল্লেখ করে থানায় মামলা ও লিখিত অভিযোগ করে না। তারপরও র‌্যাবের বিরুদ্ধে আসছে বেশুমার অভিযোগ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভূক্তভোগী মানুষ প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ সম্মেলনসহ নানা উপায়ে র‌্যাবের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উত্থাপন করছেন। র‌্যাব এসব অভিযোগের সন্তোষজনক কোন জবাব দিতে পারছে না। র‌্যাবের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে প্রশ্ন উঠেছে এই বাহিনীর লাগাম এখন কার হাতে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাহিনীটির নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। অনেকটা ফ্রি স্টাইলে চলছে র‌্যাব। এর জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, কর্মকান্ডের গ্রহনযোগ্যতা সবকিছু নিয়েই রয়েছে হাজারো প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে এলিটফোর্স হিসেবে পরিচিত র‌্যাব চলছে অদৃশ্য কমান্ডে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই আসছে সেখান থেকে। ক্ষমতাসীন ওই মহলটির নানা হুকুম তামিল করতে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে র‌্যাবকে। এসব হুকুম তামিল করতে গিয়েই ইমেজ সংকটে পড়েছে র‌্যাব। পাশাপাশি র‌্যাবের কিছু সদস্যও জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ডে। দু’ই মিলে বেহাল অবস্থায় র‌্যাব। র‌্যাবের কাজ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেফতার, অস্ত্র উদ্ধার, চরমপন্থী ও দাগী আসামীদের গ্রেফতার। কিন্তু তা না করে র‌্যাব এখন সরকার বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার ও নির্যাতনেই কাজেই বেশি ব্যস্ত। শুরুর দিকে র‌্যাবের প্রতিটি ক্রসফায়ার ছিল ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। ওইসব ক্রসফায়ারে র‌্যাবকে সাধুবাদ জানায় সাধারণ মানুষ। ওই সময় ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্রিয়া অনুসরণ করা হতো, নেয়া হতো উচ্চ পর্যায়ের গ্রীন সিগন্যাল। কিন্তু ক্রমেই সেই ক্রসফায়ার হয়ে ওঠে ছোটখাট সন্ত্রাসী, ছিচকে মাস্তান ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে গুপ্ত হত্যা ও ক্রসফায়ার, ও অস্ত্রÑমাদক মামলায় নীরিহ ব্যক্তিদের ফাঁসানোর অভিযোগও ওঠে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। ফলে এলিট ফোর্সের মর্যাদা হারায় র‌্যাক। তাদের কর্মকান্ড প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয় দেশজুড়ে। র‌্যাবের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, পুরানো ঢাকার দুই ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ৪৫ ভরি স্বর্ণ এবং ১৬ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া, এই অভিযোগে র‌্যাব-৩ এর সদস্য পুলিশের সাবইন্সপেক্টর (এসআই) আজিজুল হক, বিডিআরের হাবিলদার রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতারের পর রাজধানীর মতিঝিল থানা পুলিশ রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে।র‌্যাব-১০ এর এক অধিনায়কের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে ৬ লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগ করেছেন রাজধানীর সূত্রাপুরের মিনারা বেগম। তার ছেলে ঢাকার ৮১ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা সাইজুদ্দিন ওরফে সাজুকে র‌্যাব-১০ সদস্যরা গ্রেফতার করে। গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর রাত দুইটার দিকে সাদা পোশাকধারী র‌্যাব সদস্যরা সূত্রাপুরের ৭৯ নং পারগেন্ডারিয়া এলাকার বাসায় অভিযান চালিয়ে সাজুকে আটক করে নিয়ে যায়। আত্মীয় স্বজনরা র‌্যাব কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি সাজুর মুক্তির জন্য ১০ লাখ টাকা দাবী করেন। পরবর্তীতে তাকে ৬ লাখ টাকা নেয়। মিনারা বেগম বলেন, টাকা নিয়েও তার ছেলে সাজুকে ছেড়ে দেয়নি র‌্যাব। পরদিন রাতেই তাকে ক্রসফায়ার দিয়েছে র‌্যাব। র‌্যাব-৩ এর সহকারী পরিচালক এএসপি শোয়েব আহমেদসহ ৩ র‌্যাব সদস্যকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেফতার করে পুলিশ। কমলাপুরে ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম হিরনকে আটক করে প্রায় ১১ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। গত বছর ১৬ জুলাই পুরান ঢাকার বংশালে মটরসাইকেল পার্টর্স ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী বাবুলকে র‌্যাব-১০ এক মেজর আটক করে পিটিয়ে হাত ও পা ভেঙে দেয়। লিয়াকত আলীকে সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে স্টাম্পে সাক্ষর রাখা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে বংশালে মোটর পার্টস মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এলাকার বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। গত ২১ মে সাতক্ষীরায় চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলামের বাড়িতে অন্ত্র রেখে অস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজাতে যায় র‌্যাব। ওই সময় র‌্যাবের ২১ সদস্যকে এলাকার লোকজন ৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে স্থানীয় থানাপুলিশসহ প্রশাসনের উপস্থি’তিতে র‌্যাব কর্মকর্তা ভুল স্বীকার করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থণা করলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই সময় দু’টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু সেই কমিটির রিপোর্ট আদৌ প্রকাশিত হয়নি। গত ২৭ জুন বিএনপি আহুত হরতাল চলাকালে ঢাকার সাবেক মেয়র ও গৃহয়াণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের বাসায় তাণ্ডব চালায় র‌্যাব। মির্জা আব্বাসের ৮৫ বছর বয়সের বৃদ্ধা মা পর্যন্ত রক্ষাপায়নি নিষ্ঠুর র‌্যাব সদস্যদের হাত থেকে। এঘটনায় শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতা ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর চৌধুরী আলমক অপহরণ ও তাকে গুম করার অভিযোগ উঠেছে। মাস খানেক আগে ইন্দিরা রোড থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। এখন পর্যন্ত তার কোন হদিস নেই। এলিট ফোর্স র‌্যাব কেন এসব করছে এর অনুসন্ধানে জানা যায়, র‌্যাবের শীর্ষ পর্যায়ে উচ্চাভিলাসী কিছু কর্মকর্তা ভালো পোস্টিং ও সরকারকে খুশি করার জন্য এসব কাজ করছে। তারা এলিট ফোর্স হিসেবে আইন শৃংখলার নিয়ন্ত্রণের চাইতে সেই অদৃশ্য শক্তিকে খুশি করার জন্য কাজ করছে। যার ফলশ্র“তিতে র‌্যাবের এই পরিনতি। এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমান আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, র‌্যাবের অধিকাংশ সদস্যই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ম পালন কছে। তারপরও কিছু কিছু সদস্যসের নৈতিক স্খণল হয়েছে। যারাই অন্যায় করছে তাদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হচ্ছে। র‌্যাবে কোন ধরনের অন্যায় প্রশয় দেয়া হয় না। এই বাহিনীতে অন্যায় কাজের জন্য কাউকে ক্ষমা করার নজির র‌্যাবে নেই। ডিজি র‌্যাব আরো বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ঢাকা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমকে উদ্ধারের জন্য অভিযান চলছে। তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় র‌্যাব জড়িত নয়। তিনি আরো বলেন, শৃংখলা বিরোধী কাজের জন্য গত ৭মাসে র‌্যাবের ১২১ সদস্যকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৪৩ জনকে গুরুদন্ড এবং ৭৮জনকে লঘুদন্ড দেয়া হয়েছে। তার মতে জনগণের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায় র‌্যাব এমন কোন কাজ করে না।

No comments:

Post a Comment