Thursday, October 21, 2010

১০ বছর ১০ মাসে বাংলাদেশ সীমান্তে ১০০৫ (এক হাজার পাঁচ) বাংলাদেশি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে লাশের মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশি সহস্রাধিক বাংলাদেশী নাগরিক বিচার বর্হিভুক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে আমাদের সীমান্ত। সরকার কর্তৃক জোরালে প্রতিবাদ না করা, সরকারের নমনীয় মনোভাব, ভারত নির্ভর কুটনৈতিক তৎপরতা ও এক শ্রেণীর সরকারি আমলাদের ভারত প্রীতির কারনে এসব হত্যাকাণ্ডে কখনোই জোরালো প্রতিবাদ করা হয়নি। চাওয়া হয়নি ক্ষতিপুরণ। এসব হত্যকাণ্ডের প্রতিবাদে বিডিআরকেও যথযথ ব্যবস্থা নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। ফলে অব্যহতভাবেই সীমান্তে মানবাধিকার লংঘন বাড়ছে।

গত বছরের ২৫ ও ২৬ ফেব্র“য়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের পর-
কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়ে আমাদের সীমানা। মনোবল ভেঙে পড়ে বিডিআরের। এখন বহু বিডিআর জওয়ান আসামী কাঠগড়ায়। ধীরে ধীরে এসব ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠছে বিডিআর। এরপরও তারা লাঠি হাতে সীমান্ত পাহারা দিতে হয়। তাদের নেই পর্যান্ত সরঞ্জাম। নেই তাৎক্ষনিক গুলি করার অনুমতি। যার ফলে অব্যহতভাবে মানবাধিকার লংঘন করে চলেছে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স-বিএসএফ।অনুসন্ধানে দেখা হেছে, সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা বন্ধে বিএসএফের শীর্ষ ব্যক্তিদের কোনো প্রতিশ্রুতি কার্যকর হচ্ছে না। বরং দিন দিন বেড়ে চলেছে বাংলাদেশী হত্যা ও মানবাধিকার লংঘন। গত শনিবার মাত্র একদিনে ৩ বাংলাদেশীকে গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করেছে বিএসএফ এবং ভারতীয় লোকজন। সোমবার কুষ্টিয়া সীমান্ত থেকে ৫ বাংলাদেশীকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। এসব নিয়ে সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করলেও বাংলাদেশ সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সীমান্তে হত্যা বন্ধে অতীতে বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএসএফ কর্মকর্তারা। সম্প্রতি বিডিআর-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শেষেও বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা বন্ধের জোরালো প্রতিশ্রুতি দেন বিএসএফ মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব। তার এই প্রতিশ্রুতির পরও হত্যাকাণ্ড চলছে। পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা বন্ধে বিএসএফ কর্মকর্তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জঘন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। গত শনিবার হতাকাণ্ডের শিকার ৩ জন নেত্রকোনার হলেন, কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের সন্ন্যাসী পাড়া গ্রামের জসিম উদ্দিন নামে এক বাংলাদেশী কৃষক বিএসএফের গুলিতে নিহত হন। ফসলের জমি দেখতে গেলে বিএসএফ তাকে গুলি করে হত্যা করে। একই দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ শিংনগর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে খুন হন বাংলাদেশী নাগরিক আবদুল লতিফ। পঞ্চগড় সদর উপজেলায় ভারতীয় ছিটমহলের ভেতর গণপিটুনিতে এক বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হন। ওই বাংলাদেশীর লাশ ফেরত না দেয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা ছিটমহলের ভেতরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। এর আগে গত ৫ অক্টোবর শেরপুরের নলিতাবাড়ী সীমান্তে সাধন কোচ নামে অপর এক বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় পুলিশ। ঘটনার ৩ দিন পর তার লাশ হস্তান্তর করা হয়। গত ১২ অক্টোবর লালমনিরহাট সদর উপজেলার দুর্গাপুর সীমান্তে এক বাংলাদেশীর লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় লোকজন আশঙ্কা করেন বিএসএফ তাকে হত্যা করে রাতের অন্ধকারে লাশ ফেলে গেছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ সীমান্ত থেকে সোমবার ফারুক মিয়া, আশিক, ফারুক, সুমন আলী ও সুমন নামে ৫ বাংলাদেশী নাগরিককে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। তাদের বাড়ি রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মুন্সীগঞ্জ ভাঙ্গাপাড়া গ্রামে। গরুর খাবারের জন্য ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ঘাস কাটতে গেলে ভারতের নদিয়া জেলার হোলবাড়িয়া থানার কৃষাণ ক্যাম্পের টহলরত বিএসএফ সদস্যরা তাদের আটক করে নিজ ক্যাম্পে নিয়ে যায়।মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রেকর্ড অনুসারে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফসহ ভারতীয় নাগরিকদের হাতে ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত (১৯ জুন মঙ্গলবার) কমপক্ষে ১০০৫ বাংলাদেশী নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছর সীমান্তে নিহত হয়েছে ৫৩ জন। একই সময় বিএসএফের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হয়েছেন ৯৪০ জন, অপহরণের শিকার হয়েছেন ৯৪৫ জন, নিখোঁজ হয়েছেন ১৮৮ জন ও পুশইনের শিকার হয়েছেন ২৪০ জনের বেশি। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭ নারী। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন ৫৩ জন। এর আগে বিএসএফের হত্যার শিকার হয়েছেন ২০০৯ সালে ৯৬, ২০০৮ সালে ৬২, ২০০৭ সালে ১২০, ২০০৬ সালে ১৪৬, ২০০৫ সালে ১০৪, ২০০৪ সালে ১৩৫, ২০০৩ সালে ৪৩, ২০০২ সালে ১০৫, ২০০১ সালে ৯৪ এবং ২০০০ সালে ৩৯ বাংলাদেশী নাগরিক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, পঞ্চগড়, সিলেট, শেরপুর, ফেনী, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুড়িগ্রামসহ সবক’টি সীমান্তে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে বিএসএফ। সীমান্তবর্তী এমন কোনো গ্রাম নেই, যেখানে মানুষ বিএসএফের আগ্রাসনের শিকার হননি। তাদের আগ্রাসী তৎপরতায় সীমান্তের মানুষ এখন নিরাপত্তাহীন। তাদের সময় কাটে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা আর মৃত্যুর বিভীষিকার মধ্যে। সবারই ভয় আবার কখন গুলি চালায় বিএসএফ। গুলি করে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা, নির্যাতন, মারধরসহ হাজারও অভিযোগ বিএসএফের বিরুদ্ধে। শুধু হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, পুশইন, গুলিসহ নানা অপকর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বিএসএফ। অপপ্রচারেও তারা কম যাচ্ছে না। খোদ বিএসএফ প্রধান বাংলাদেশীদের অপরাধী বানিয়েছেন। গত বছরের ১৪ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিডিআর-বিএসএফের তিন দিনব্যাপী সম্মেলন শেষে বিএসএফের তত্কালীন মহাপরিচালক মহেন্দ্রলাল কুমাওয়াত বলেন, ‘সীমান্তে রাতের বেলা কাঁটাতারের বেড়া কাটতে গেলে বিএসএফ বাংলাদেশীদের ওপর গুলি ছোড়ে এবং এতে তাদের মৃত্যু হয়। অনেক ঘটনায় বিএসএফ চ্যালেঞ্জ করে ও আত্মরক্ষার জন্য গুলি ছোড়ে।’ গত ২৭ অক্টোবর বিএসএফ ডিজি বলেন, সীমান্তে যারা মারা যায় এরা সবাই ক্রিমিনাল। তাদের অর্ধেক ভারতীয় নাগরিক। বিএসএফ মহাপরিচালকের এ ধরনের বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। সংস্থা থেকে বলা হয়, বিএসএফ মহাপরিচালকের এ ধরনের বক্তব্য সীমান্তে বিএসএফের হত্যাযজ্ঞ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে বৈধতা দেবে। বিএসএফ অনেক সময় বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে গুলি করে ও ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। অধিকারের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নিহত ও আহতদের প্রায় সবাই বাংলাদেশী নাগরিক। অবৈধভাবে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানের সঙ্গে কোনো বাংলাদেশী যদি জড়িত থেকেও থাকেন সেক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, বিচারবহির্ভূতভাবে নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের হত্যা কখনোই সমাধান হতে পারে না।পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে হত্যা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ একাধিকবার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে; কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরপরই হত্যাসহ অন্যান্য অবৈধ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে বিএসএফ। প্রতিকারের আশ্বাস পরিণত হয়েছে প্রতারণায়। বিডিআরের সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা বন্ধে বিএসএফ কর্মকর্তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা ভঙ্গের একের পর এক জঘন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সম্মেলন চলাকালে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সীমান্তে বাংলাদেশী জনগণকে হত্যা বন্ধ করতে অনুরোধ করেছেন বিএসএফ ডিজির কাছে। বিএসএফ কর্তৃপক্ষের বোঝা উচিত ছিল, সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান এটাই। এরপরও বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার মাধ্যমে বিএসএফ বাংলাদেশ সরকারকেই অপমান করছে। আমাদের সরকারের উচিত তার তীব্র প্রতিবাদ জানানো এবং বিডিআরকে তার সমুচিত জবাব দেয়ার নির্দেশ দেয়া। কিন্তু সরকার সেটা করছে না। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান আমাকে বলেছিলেন, সাধারণ মানুষ যেখানেই হত্যা, নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হবে সেখানেই বলিষ্ঠভাবে তার প্রতিবাদ জানাতে হবে। ভারতীয় নাগরিক কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা ও আহত হলে ভারতের কাছ থেকে তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো অতীতে বিভিন্ন সরকার প্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিব পর্যায়ের আলোচনা সর্বোপরি বিডিআর-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের আলোচনায় এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ করা হয়নি। পারতপক্ষে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার জনগণই সাক্ষী, বিএসএফ কীভাবে সীমান্ত এলাকায় হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ, জবরদখল ও পুশ-ইনে জড়িত। সীমান্তবাসীর সাহসী প্রতিরোধে ওরা মাঝে মাঝে হটে যেতে বাধ্য হয়। বিএসএফ টার্গেট করেই হত্যাকাণ্ড চালায়। সীমান্তে ওদের আগ্রাসী তত্পরতা অতি সাধারণ ঘটনা। এটা বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া।অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান আরো বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক শ্রেণী কখনোই বাংলাদেশকে সম্মানের সঙ্গে দেখেনি। তাই স্বাধীনতার পর থেকে দ্বিপাক্ষিক যতগুলো চুক্তি হয়েছে তার কোনোটারই সফল বাস্তবায়নের ইতিহাস নেই। ভারতের শাসকশ্রেণী ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই প্রতারণার শিকার হয়েছে। বাংলাদেশকে স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের মর্যাদা না দিয়ে ভারতীয়রা বার বারই বাংলাদেশীদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করছে; যার ধারাবাহিকতায় সীমান্ত এলাকায় কৃষক, ব্যবসায়ী, নারী, শিশু কেউই এখন নিরাপদ নন। চলতি বছরও শিশু অপহরণের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে নারী ধর্ষণের ঘটনা। আদিলুর রহমান বলেন, আমরা যে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি সেটা ভুলে ভারত বার বারই সীমান্তে হত্যা, নির্যাতন ও আগ্রাসী মনোভাব চালাচ্ছে। আগ্রাসী মনোভাব দিয়ে আমাদের দমন করা যাবে না। রৌমারী বড়াইবাড়িসহ বিভিন্ন ঘটনায় বিএসএফের আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলে বাংলাদেশের মানুষ অতীতে সেটার প্রমাণ দিয়েছে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যেখানেই নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হবে সেখানেই বলিষ্ঠভাবে তার প্রতিবাদ জানাতে হবে; ভারতের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে; কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো অতীতের বিভিন্ন সময়ে সরকার প্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিব পর্যায়ের আলোচনা সর্বোপরি বিডিআর-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের আলোচনায় এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ করা হয়নি। বিষয়টিকে বার বারই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে অব্যাহত গতিতে সীমান্তে মানবাধিকার লংঘন বাড়ছেই।

No comments:

Post a Comment